ঝাড়গ্রাম

জঙ্গলমহলের বাঁদনা-পরবে দেবজ্ঞানে জীবসেবা

স্বপ্নীল মজুমদার

জঙ্গলমহলের বাঁদনা-পরবে দেবজ্ঞানে জীবসেবা - West Bengal News 24
ফাইল ছবি

ঝাড়গ্রাম: আর কয়েকদিন পরেই জঙ্গলমহলের ‘বাঁদনা-পরব’-এর শুরু। আমন চাষের শেষে গরুগাভীদের বন্দনা করে কৃতজ্ঞতা জানানোর এই উৎসব পালিত হচ্ছে সুপ্রাচীন কাল থেকে।

জঙ্গলমহলের মূলবাসীদের বিশ্বাস, কালীপুজোর রাতে মর্ত্যলোকের প্রতিটি গোয়াল পরিদর্শনে আসেন স্বয়ং মহাদেব। তাই নোংরা ঝেঁটিয়ে, ধূপ-ধুনো জ্বালিয়ে গোয়ালঘর পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে রাখা হয়।

লোক সংস্কৃতি গবেষক মধুশ্রী হাতিয়াল বলেন, “বন্দনা থেকে কিংবা বন্ধন থেকেও ‘বাঁদনা’ শব্দটা এসে থাকতে পারে। কারণ পরবের শেষ দিনে খুঁটিতে গরু-মোষদের বেঁধে রেখে শারীরিক কসরৎ করানো হয়।” কার্তিক মাসের অমাবস্যার রাত থেকে শুরু হওয়া বাঁদনা পরব শেষ হয় ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিন।

জঙ্গলমহলের বাঁদনা-পরবে দেবজ্ঞানে জীবসেবা - West Bengal News 24
ফাইল ছবি

কালীপুজোর রাতে গান শুনিয়ে গরুর সেবা করা হয়। প্রতিপদের দিন হয় গোয়াল পুজো আর দ্বিতীয়ার দিন পরবের অন্তিম পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয় ‘গরু খুঁটান’। তবে কোনও কোনও এলাকায় পূর্ণিমা পর্যন্ত যে কোনও দিনে ‘গরু খুঁটান’ হয়।

ঝাড়গ্রামের বিশিষ্ট ঝুমুর গায়িকা ইন্দ্রাণী মাহাতো বললেন, “দুর্গাপুজোয় আমাদের নতুন পোশাক হয় না। বাঁদনা পরবেই আমরা নতুন জামাকাপড় পরি।”

আরও পড়ুন: প্রস্তুত হচ্ছেন তাপসী

স্থানীয় সূত্রে জানা গেল, এই উৎসবের নানা অঙ্গ আছে যা জঙ্গলমহলের একান্তই নিজস্ব। মহুল গাছের কড়চা ফল ও তিল একসঙ্গে পিষে যে তেল হয় তা দিয়েই প্রদীপ জ্বালানো হয়। ওই তেল গরুর শিঙেও মাখানো হয়।

জঙ্গলমহলের বাঁদনা-পরবে দেবজ্ঞানে জীবসেবা - West Bengal News 24
ফাইল ছবি

জঙ্গলমহলের বাজার হাটে নতুন মাটির হাঁড়ি, সরা, মাটির প্রদীপের পাশাপাশি, কুলো, ঝুড়ি কেনাকাটা ধুম পড়ে যায়। এবার করোনা আবহের মধ্যেও গ্রামে গ্রামে সাধ্যমত আয়োজন চলছে।

উৎসবের আগে থাকতেই এলাকাবাসীর মুখে মুখে ফেরে বাঁদনা পরবের গান, “কনও নদী বহে হবকি ডবকিয়া কনও নদী বহেই নিরাধার/ কাঁসাই নদী বহে হবকি ডবকিয়া সবন্নখা বহে নিরাধার।”

নানা পর্যায়ে পালিত হয় বাদনা পরব। কালীপুজোর রাতে গান শুনিয়ে গরুকে ‘জাগানো’ হয়। ঢোল, মাদল, বাঁশি বাজিয়ে লায়ার (পূজারী) বাড়ি থেকে বেরোয় ‘ঝাঁগোড়’ বা জাগরণী গানের দল।

আরও পড়ুন: নগ্নতার পর এবার সিঁদুর ভরতি মুখের ছবি, ফের নেটদুনিয়ার চর্চায় এই অভিনেতা

গ্রামের সব বাড়ি থেকে অন্তত একজন করে পুরুষ এই দলে থাকেন। এই দলটি প্রত্যেক গৃহস্থের গোয়াল ঘরে গিয়ে গান করে—–“জাগে মা লক্ষ্মী জাগে মা ভগবতী, জাগে তো অমাবস্যার রাতি/ জাগে তো প্রতিপদ দেবে গো মাইলানি, পাঁচ পুতাঞঁ দশধেনু গাই।”

জঙ্গলমহলের বাঁদনা-পরবে দেবজ্ঞানে জীবসেবা - West Bengal News 24
ফাইল ছবি

অমাবস্যার রাতে বাড়ি-বাড়ি ‘ঝাঁগোড়া পিঠা’ বানানো হয়। জাগরণের গানের দলকে গৃহস্থেরা সেই পিঠে খেতে দেন। গরুকেও পিঠে খাওয়ানো হয়। পিঠে বানানোর জন্য কেবলমাত্র ঢেঁকিতে কোটা চালের গুঁড়ি লাগে।

প্রতিপদের দিন সকালে হয় ‘গোয়াল পূজা’। এ দিন চালগুঁড়ির সঙ্গে পাইনা লতা নামে জঙ্গলের এক ধরনের পিচ্ছিল লতা বেটে উঠোনের দরজা থেকে গোয়াল ঘর ও প্রতিটি ঘরের সামনে আলপনা দেওয়ার রীতি রয়েছে। আলপনার মধ্যে দেওয়া হয় সিঁদুরের ফোঁটা।

জঙ্গলমহলের বাঁদনা-পরবে দেবজ্ঞানে জীবসেবা - West Bengal News 24
ফাইল ছবি

গোয়াল ঘরের এককোণে তিনটি কাঁচা মাটির মণ্ডর মধ্যে ডাঁটা সমেত তিনটি সাদা শালুক ফুল রাখা হয়। গৃহপালিত পশুদের মঙ্গল কামনায় নিবেদন করা হয় আতপ চাল ও ফল-মিষ্টির নৈবেদ্য। ব্যাঘ্রদেবতা বা ‘বাঘুত’-এর সন্তুষ্টির জন্য কেউ কেউ গোয়াল ঘরে পাঁঠা বা মোরগ বলি দেন।

সেই সঙ্গে চাষের উপকরণ— লাঙল, জোয়াল, মই ধুয়ে পরিষ্কার করে রাখা হয় বাড়ির উঠোনের তুলসী তলায়। বাড়ির মহিলারা স্নান করে ভিজে কাপড়ে গোয়াল ঘরের মধ্যেই উনুন বানিয়ে মাটির মালসায় পিঠে বসান। চালগুঁড়ি, আখের গুড় ও দুধ দিয়ে মেখে এক হাতা করে গরম ঘিয়ে ভেজে তোলা হয় এই ‘গরৈয়া পিঠা’।

সাধারণত ভ্রাতৃদ্বিতীয়ার দিনে বাঁদনা পরবের শেষ পর্যায় ‘গরু খুঁটান’ অনুষ্ঠিত হয়। শালবল্লিতে বেঁধে রাখা বলদ বা এঁড়ে গরুদের সামনে ঝুলিয়ে দেওয়া হয় মৃত মোষের চামড়া।

বলদ বা এঁড়ে গরুগুলো যখন ওই চামড়া গোঁতাতে যায়, বেজে ওঠে ঢাক, মাদল। হর্ষধ্বনি দিয়ে ওঠে সমবেত জনতা। ‘গরু খুঁটানে’র সময় সমবেত গান করা হয়, “এতদিন চরালি ভালা, কোচাখুঁদি রে, আজ তো দেখিব মরদানি/ চার ঠেঙে নাচবি, দুই শিঙে মারবি, রাখিবি বাগাল ভাইয়ের নাম…..।

 

 

আরও পড়ুন ::

Back to top button