তালেবান সরকারকে কেন এখনো কোনো দেশ স্বীকৃতি দেয়নি?

আফগানিস্তানে তালেবানের অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেলেও তাদের এখনো কোনো দেশ আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়নি। কিছু শর্ত না মানলে সহজেই স্বীকৃতি মিলবে বলে মনে হচ্ছে না।
বিবিসি’র এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বৈধতা এবং স্বীকৃতি পেতে তালেবানের আসল পরীক্ষা হবে সন্ত্রাস নিয়ে তাদের অবস্থানের ওপর।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পাঁচ দিনের মাথায় রবিবার কাবুল সফরে যান কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল-থানি। তিনি আফগান প্রধানমন্ত্রী মোল্লাহ হাসান আখুন্দের সঙ্গে একটি বৈঠক করেন।
কিন্তু দোহায় ফিরে সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, তালেবানের সরকারকে স্বীকৃতি দেওয়ার সময় এখনো আসেনি।
অন্যদিকে, তালেবানকে যে দেশটির সবচেয়ে সমর্থনপুষ্ট বলে মনে করা হয়, নতুন কাবুল সরকার নিয়ে সেই পাকিস্তানের ভূমিকাও অস্পষ্ট।
আরও পড়ুন : বিশ্বে ২৪ ঘণ্টায় বেড়েছে শনাক্ত ও মৃত্যু
পাকিস্তানের সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর প্রধান লে. জেনারেল ফায়েজ হামিদ গত সপ্তাহে কয়েকদিন কাবুলে ছিলেন। এরই মধ্যে বিমান বোঝাই করে আফগানিস্তানে খাবার এবং ওষুধ পাঠিয়েছে পাকিস্তান।
কিন্তু তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির প্রশ্নে ইসলামাবাদ এখনো চুপ। তালেবানের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির দিনক্ষণের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি চীনও।
লন্ডনে আফগান সাংবাদিক এবং আফগানিস্তানের রাজনীতির বিশ্লেষক সাইয়েদ আব্দুল্লাহ নিজামী বলেন, কয়েকটি দেশ- বিশেষ করে কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই), চীন ও পাকিস্তান তালেবানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির কোনো প্রতিশ্রুতি এখনো তারা দিচ্ছে না।
তিনি বলেন, ‘দেখে মনে হচ্ছে একটি দেশ যেন আরেকটি দেশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে তারা কী করে। একজন সিদ্ধান্ত নিলেই আরেকটি এগোবে।’
নিজামী বলেন, ‘পাকিস্তান তাকিয়ে চীনের দিকে, চীন হয়তো দেখছে পাকিস্তান কী করে। উজবেকিস্তান, তুর্কমিনিস্তান চেয়ে আছে সম্ভবত রাশিয়ার দিকে।’
আর কাতারের সঙ্গে তালেবানের দহরম-মহরম হয়তো সৌদি রাজবংশের পছন্দ নয়।
তালেবানের জন্য একমাত্র আশার কথা- যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের সিংহভাগ পশ্চিমা মিত্র এখনো তালেবানের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি নাকচ করছে না। ফ্রান্স এবং ডেনমার্ক ছাড়া কোনো দেশই বলেনি, তালেবানকে কখনোই তারা মেনে নেবে না।
আরও পড়ুন : মাস্ক না পরায় সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে জরিমানা
তবে মানবাধিকার ও নারী অধিকার নিশ্চিত করা এবং আইএস ও আল-কায়েদার মতো গোষ্ঠীগুলোকে আশ্রয়-প্রশ্রয় না দেওয়ার শর্ত আরোপ করছে তারা।
তবে এসব নিয়ে বেশি চাপাচাপি করলে তালেবান চীন ও রাশিয়ার পুরোপুরি মুখাপেক্ষী হতে পারে, এ ভয়ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে।
এ কারণেই হয়তো যুক্তরাষ্ট্র বলছে, তারা আফগানিস্তানে মানবিক সাহায্য অব্যাহত রাখবে। তবে সেই সাহায্য যাবে শুধুমাত্র জাতিসংঘ এবং এনজিও’র মাধ্যমে।
সোমবার জেনেভাতে জাতিসংঘের উদ্যোগে আফগানিস্তানের জন্য জরুরি তহবিল সংগ্রহের জন্য আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ১০০ কোটি ডলারেরও বেশি অর্থ সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে।
এটি ধারণা দিচ্ছে, পশ্চিমা সরকারগুলো হয়তো তালেবানের সামনে দরজা পুরোপুরি বন্ধ করতে চাইছে না। তবে এই তহবিলের সঙ্গে মানবাধিকার, নারী অধিকার শর্ত জুড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত স্পষ্ট।
বিভিন্ন আফগান জাতিগোষ্ঠী, সংখ্যালঘু এবং ভিন্নমতের লোকজনকে তালেবান তাদের সরকারে শেষ পর্যন্ত কতটা জায়গা দেবে তা স্পষ্ট নয়।
অবশ্য তাদের শিক্ষানীতিতে নারীদের শিক্ষার অধিকার মেনে নিয়েছে তালেবান, যদিও নির্দেশ দিয়েছে যে নারী-পুরুষ একসঙ্গে শ্রেণিকক্ষে বসা চলবে না।
তবে বৈধতা এবং স্বীকৃতি পেতে তালেবানের আসল পরীক্ষা হবে সন্ত্রাস নিয়ে তাদের অবস্থানের ওপর। কারণ শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, এই ইস্যুতে চীন, রাশিয়া এমনকি পাকিস্তানও কমবেশি উদ্বিগ্ন।
পাকিস্তান চায় তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান-টিটিপি (যা পাকিস্তান তালেবান নামে পরিচিত) নেতাদের ধরে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হোক। চীন চায় শিনজিয়াংয়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী ইটিআইএম-কে আফগানিস্তান থেকে হটাতে হবে।
অন্যদিকে, আরেক প্রতিবেশী ইরান চায় আইএস এবং আল-কায়েদা যেন আফগানিস্তানে না থাকে। আর রাশিয়া এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর চাওয়া হলো, আইএস-কে (ইসলামিক স্টেট-খোরাসান) যেন কোনোভাবেই আফগানিস্তানে প্রশ্রয় না পায়।
সুতরাং এক মাস আগে কাবুল দখল তালেবানের জন্য যত সহজ ছিল, বৈধতা অর্জন ও দেশ শাসন করা হবে ততটাই জটিল এবং কঠিন।



